নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অলি আহাদ। শৈশব থেকেই শিক্ষা ও রাজনীতির প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। ঢাকা কলেজে অধ্যয়ন শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ ভর্তি হন।
১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দীর্ঘ ৫৮ বছর পর, ২০০৬ সালে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়—যা ছিল ইতিহাসের এক প্রতীকী সংশোধন।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়।
রাজনৈতিক জীবনের বিস্তৃতি
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি।
১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি মাওলানা ভাসানী-এর সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক ধারায় সম্পৃক্ত হন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি কাজ করেছেন এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমান-এর মতো প্রখ্যাত নেতাদের সঙ্গে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয় সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। নীতির প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে পথ ভিন্ন হলেও আদর্শিক অবস্থানে ছিলেন দৃঢ়। পরবর্তীকালে তিনি ডেমোক্রেটিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হিসেবে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখে।
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। এরশাদ আমলে একাধিকবার গ্রেফতার হন এবং তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে তিনি কখনও আপস করেননি।
তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এছাড়া তার রচিত গ্রন্থ “জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫–১৯৭৫” বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।
অলি আহাদের সহধর্মিণী ছিলেন প্রফেসর রশিদা বেগম। তাদের একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, যিনি বর্তমানে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি আবেগঘনভাবে বলেছিলেন, বাবাকে হারানোর দিন তার মনে হয়েছিল যেন তিনি পৃথিবীর সবকিছু হারিয়েছেন।
দীর্ঘ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার পর ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অলি আহাদ। তার প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
অলি আহাদ ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ ও আপসহীন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন—প্রতিটি অধ্যায়ে তার ভূমিকা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। তার জীবন ও সংগ্রাম আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।